ঢাকা শুক্রবার, ১৪ জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৭ জিলহজ, ১৪৪৫ হিজরি

বিভাগসমূহ

পঞ্চগড়ে পাগলির মেলায় হাজারো মানুষের ঢল

পঞ্চগড় প্রতিনিধি || ৬:৩১ অপরাহ্ণ ॥ জুলাই ৩০, ২০২৩

শতবছরের ঐতিহ্য ধরে রাখতে ও মহরমের ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণে পঞ্চগড় সদর উপজেলার শেখপাড়া গ্রামে এবারও বসেছিল পাগলির মেলা। প্রতি বছর হিজরি সনের মহররম মাসের এগার তারিখে বসে এ মেলা। ফাঁকা মাঠ না থাকায় গ্রামের সড়কের ওপরেই একদিনের জন্য মেলাটি বসে। গতকাল রোববার দুপুর গড়াতেই দেখা গেল কাঁচা সড়কটির দু’ধারে বসেছে হরেক রকমের দোকান। মেলার চারপাশ জুড়ে জিলাপি ভাজার মৌ মৌ গন্ধ। বসেছে হরেক রকমের দোকান। বেলুন, বাঁশি আর খেলনা নিয়ে ছোটদের ছুটোছুটিতে মেলাটি উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। বসেছে মুড়ি-মুড়কি আর স্থানীয় হস্ত ও কুটির শিল্পীদের তৈরি বাহারি তৈজসপত্রের পসরা। একদিনের জন্য বসা পাগলীর এ মেলাটি গ্রামটিকে যেন অন্য রকম করে ফুটিয়ে তুলেছে।
স্থানীয়রা জানায়, প্রতিবছরই মহরমের পরদিন অর্থাৎ এগার মহররম মনের বাসনা পূর্ণ করতে অনেকেই আসেন মানত করতে। অসংখ্য উপকৃত মানুষের সেই ইচ্ছে পূরণও হয়। তাছাড়া গ্রামীণ মেলার ঐতিহ্য ও বিনোদন লাভের জন্য অসংখ্য মানুষ মেলাতে আসে। বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে অনুষ্ঠিত মেলায় আসা সব বয়সী মানুষ কিছু সময়ের জন্য হলেও ফিরে পান গ্রামীণ জীবনের হারানো ইতিহাস ঐতিহ্যকে। কোনো একটি বিশেষ দিবসকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত মেলায় শিশু কিশোরদের সঙ্গে বড়দেরও মনকে প্রফুল্ল করে।
মীরগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আতাউর রহমান জানান, স্থানীয় বয়ঃজ্যেষ্ঠদের কাছে শুনেছি, এক সময় আমিরন নামের মানসিক ভারসাম্যহীন এক পাগল নারী পঞ্চগড় সদর উপজেলার শেখপাড়া গ্রামে বসত গাড়ে। ঘন গাছপালা আর জঙ্গলে ঢাকা গ্রামটিতে তিনি নিভৃতে বাস করলেও আশুরার সময় তিনি লোকালয়ে আসতেন। স্থানীয় লোকজনকে শোনাতেন ইমাম হাসান-হোসাইনের ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে রচিত মার্সিয়া গীত। স্থানীয় লোকজন আমিরনের কন্ঠে মার্সিয়া শুনে আবেগে আপ্লুত হতো। আমিরনের মৃত্যুর পর স্থানীয়রা ওই গ্রামের সড়কের পাশে তাকে সমাহিত করেন। বছর ঘুরে আমিরনের কবরকে ঘিরে দোয়া ও ফাতেহা পাঠ করলেও একসময় এটা রীতিতে পরিণত হয়। মানসিক ভারসাম্যহীন আমিরনকে ঘিরে এ আয়োজনটি কালের ধারায় পাগলীর মেলা নামে পরিচিতি পায়। মহররম মাসের এগার তারিখে মেলাটি বসে। পরবর্তীতে লোকজনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কদরও বাড়ে মেলাটির। যে কারণে গ্রামের লোকজন আমিরনের কবর জিয়ারতের পাশাপাশি মনের আশা পূরণের জন্য মানত করতেন। অনেকের ইচ্ছা পূরণও হয়। দিনে দিনে এর খ্যাতি ছড়ায় পুরো পাশ্ববর্তী এলাকাতেও। তবে আমিরন কবে কোথায় থেকে গ্রামটিতে এসেছেন আর কত সালে মারা যান সে সম্পর্কে স্থানীয়রা সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানাতে না পারলেও আশুরার পরদিন গ্রামটিতে পাগলির মেলা বসছে যুগ যুগ ধরে।
স্থানীয় স্কুল শিক্ষক নুর আজম ও সাহাজুল ইসলাম জানান, বংশ পরম্পরায় এ মেলার গল্প তিনি শুনে এসেছেন। গ্রামীণ মেলার বৈচিত্র্যময় আয়োজন দেখানোর জন্য তিনি তার মেয়ে ও আত্মীয়দের নিয়ে মেলায় এসেছেন। স্কুল শিক্ষার্থী নওশীন, সম্রাট, প্রিন্স জানায়, মেলায় এসে তাদের খুব ভালো লেগেছে। তাদের পছন্দের বেশকিছু খেলনা কিনতে পারায় দারুণ খুশি তারা।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার গড়িনাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনোয়ার হোসেন দিপু বলেন, করোনাকালীন সময় মেলা বন্ধ থাকলেও গত বছর মেলা লেগেছিল। এবারও স্থানীদের সহযোগিতায় শতবছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী এ মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলার সার্বিক নিরাপত্তার জন্য গ্রাম পুলিশসহ স্থানীয় যুবকদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email